blog
Super Admin Views :97

নীলকন্ঠ

কাল থেকেই আজ আকাশটা মেঘে ঢাকা। কোথাও কোথাও ইতিমধ্যেই নেমে এসেছে হালকা বৃষ্টি। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, আর চারপাশ জুড়ে এক ধরনের শীতল অনুভূতি ছেয়ে গেছে।

 

আদ্রিজা নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তুহিনকে গাড়ি নিয়ে বের হতে দেখা মাত্রই সে এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। তুহিন আদ্রিজার দিকে এক ভ্রু উঁচু করে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

_কি চাই.?

 

আদ্রিজা মিনতি সুরে বলল,

সঙ্গে নিয়ে যান না.?

 

তুহিন কিছুক্ষণ নীরব থাকল। তারপর ফোঁস করে এক শ্বাস ফেলে বলল,

_উঠে আসো।

 

আদ্রিজা দ্রুত দরজা খুলে উঠে বসল। সে বসতেই তুহিন গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুদূর যাওয়ার পর তুহিন গাড়ি চালাতে চালাতে কয়েকবার আরো চোখে আদ্রিজার দিকে তাকাল। শেষে একটু বিরক্তির সুরে বলল,

বৃহস্পতিবার ভার্সিটিতে আসোনি কেন.?

 

হঠাৎ এই প্রশ্নে আদ্রিজা বেশ অবাক হলো। তুহিন তার খোঁজ নিচ্ছে, এই ভাবনাটা মনের অজান্তেই এক চিলতে আনন্দ এনে দিল। তবে মুখে নির্লিপ্তভাবে বলল,

_জরুরি কাজ ছিল, তাই যেতে পারিনি।

 

তুহিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

শাড়ি পরে ছেলেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোও দেখি আজকাল জরুরি কাজের মধ্যে পড়ে।

 

আদ্রিজা তেরছা চোখে তাকিয়ে বলল,

_আপনি আমাকে ফলো করছেন, স্যার.?

 

তুহিন ঠান্ডা গলায় জবাব দিল,

আমার অনেক জরুরি কাজ থাকে। আজাইরা বসে থাকি না। গাড়ি সিগনালে দাঁড়ানো ছিল, তাই চোখে পড়ে গেছে।

 

আদ্রিজা ছোট করে বলল,

_, আচ্ছা।

 

এক মুহূর্ত থেমে, তুহিনের আগের কথাটা মনে পড়তেই সে আবার বলল,

_আসলে রুমির এনগেজমেন্ট ছিল। আর রাস্তায় ওর কাজিনের সাথে দেখা হয়ে যায়।

 

তুহিন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। আদ্রিজা আবার বলল,

_ওর কাজিন ম্যারিড।

 

আদ্রিজা একের পর এক ব্যাখ্যা দিতে থাকায় তুহিনের ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি জমে উঠল। যদিও সে হাসিটা আড়াল রেখে বলল,

আমি কি শুনতে চেয়েছি.?

 

আদ্রিজা শান্ত গলায় বলল,

_না। তবুও আমি আমার দিক থেকে ক্লিয়ার থাকতে চাই।

 

কেন.?

 

_কারণ আমি আপনার কাছে অসভ্য, ম্যানারলেস হতে পারি। কিন্তু আমার অন্য কারো সাথে কোনো রিলেশন আছে, এই ধারণাটা যেন আপনার মনে না আসে।

 

তুহিন একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

আসলে সমস্যা কী.?

 

_সমস্যা আছে।

 

কি সমস্যা.?

 

_কিছু না।

 

এরপর তুহিন আর কিছু বলল না। নীরবে গাড়ি চালাতে থাকল। তবে তার ঠোঁটের কোণে যে ক্ষীণ হাসিটা খেলা করছিল, সেটা আদ্রিজার চোখ এড়িয়ে গেল।

.

.

ড্রয়িংরুমে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন শাহআলম খান। সমস্ত মনোযোগ যেন কাগজের পাতাতেই ডুবে আছে। হাতের সব কাজ সেরে আমেনা বেগম এসে স্বামীর পাশে বসলেন। কিন্তু তার উপস্থিতি শাহআলম খানের চোখে পড়ল না। অবশেষে আমেনা বেগম বিরক্ত হয়ে তার হাত থেকে খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে বললেন,

_দিনরাত শুধু নিউজপেপারেই ডুবে থাকো। আশেপাশে কোনো খেয়াল আছে নাকি.?

 

শাহআলম খান হালকা হাসি হেসে বললেন,

-তুমি থাকতে আমার আবার আশেপাশার খেয়াল রাখতে হবে.?

 

আমেনা বেগম চোখ রাঙিয়ে বললেন,

_মশকরা বাদ দাও। কিছু ভেবেছো নাকি.?

 

-কোন বিষয়ে.?

 

_আরুর আর আদ্রিশের বিয়ের ব্যাপারে।

 

শাহআলম খান একটু থেমে বললেন,

-না, এখনো কিছু ভাবিনি। মাত্র কদিন হলো এসেছে। এত তাড়াতাড়ি এসব বলা ঠিক হবে.?

 

আমেনা বেগমের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি,

_এখন বললেও যা, পরে বললেও তাই। আর আমার ছেলেটা কত কষ্ট পেয়েছে সেটা তুমি বুঝো.? আমি আমার ছেলের কষ্ট আর দেখতে পারবো না। যদি আরুর অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যায়, তাহলে আমার ছেলেটা একদম পাগল হয়ে যাবে।

 

-আরে, এমন কিছু হবে না।

 

_তুমি চুপ করো।

 

এই বলে আমেনা বেগম গতকালের রাতের দেখা সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। একটাও বাদ রাখলেন না। সব শুনে শাহআলম খান গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।

 

আমেনা বেগম আবার বললেন,

_আমি যদি কাল রাতে আরুদের বাড়ি যাওয়ার জন্য বের না হতাম, তাহলে তো এসব কিছু দেখতামই না। শোনো, যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।

 

শাহআলম খান আর কোনো কথা বললেন না। নীরবে স্ত্রীর কথা শুনে গেলেন। আমেনা বেগম ফের বললেন,

_একটা কাজ করো, আজকালের মধ্যেই এনামুল ভাইয়ের সাথে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলো।

 

এবার আর শাহআলম খান আপত্তি করলেন না। এমনিতেই আরুকে তাদের পরিবারের পছন্দ ছিল আগে থেকেই। এখন যদি কারো কোনো আপত্তি না থাকে, তাহলে চার হাত এক হতে বেশি সময় লাগার কথাও না।

 

------------------

 

সেদিন রাতের কথাগুলো আদ্রিশের কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হ্যাঁ, আমি তালহাকে ভালোবাসি। এই হচ্ছে আমাদের সম্পর্ক। তাতে আপনার কী.?”

প্রতিটি শব্দ যেন বুকের ভেতর আঘাত করে ফিরে আসে। আদ্রিশের মন সেই সত্য মানতে নারাজ। সে মানতে চায়ও না। এই স্বীকারোক্তি তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কখনোই নয়। হয়তো আপোষে, না হলে জোর করেই, আরুকে সে নিজের করেই নেবে। এই একটাই সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে তার ভেতরে জন্ম নিলো।

 

চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে এসব ভাবছিল আদ্রিশ। আজ সকালেই তড়িঘড়ি করে হসপিটালে চলে এসেছে। পরপর দুটো অপারেশন ছিল। সব সেরে চেম্বারে এসে বসতেই দেখে ঘড়িতে আড়াইটার ঘর পেরিয়ে গেছে। অথচ এই পুরো সময়টাতে আরুর সাথে একবারও দেখা হয়নি। আদ্রিশ ইন্টারকমে ডেকে নিল রহিমকে।

তোমার ম্যাম এখন কোথায়.?

 

রহিম শান্ত স্বরে উত্তর দিল,

_ফ্রেন্ডের সাথে ক্যান্টিনে গেছে একটু আগে।

 

এক মুহূর্ত দেরি না করে আদ্রিশ উঠে দাঁড়াল। কোনো কথা না বলে সোজা চেম্বার থেকে বের হয়ে ক্যান্টিনের দিকে পা বাড়াল। ক্যান্টিনে তখন আরু আর তুবা লাঞ্চ করছিল। আজ পেশেন্ট দেখতে দেখতে দেরি হয়ে যাওয়ায় সময়মতো খাওয়া হয়নি। আরু উল্টো দিকে বসে ছিল, তাই আদ্রিশকে আসতে দেখেনি। কিন্তু তুবা আদ্রিশকে দেখামাত্রই ফোন বের করে কারো কাছে ছোট্ট একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিল। এতক্ষণে তাদের খাওয়া শেষ। দুজন গল্প করছিল। ঠিক তখনই আদ্রিশ এসে দাঁড়াল। তুবার দিকে সৌজন্যমূলক একচিলতে হাসি ছুঁড়ে দিয়ে আরুর দিকে তাকিয়ে বলল,

আরু, আমার সাথে আয়। তোর সাথে কথা আছে।

 

আরু জোরপূর্বক একটা নরম হাসি মুখে এঁকে বলল,

_স্যার, আমার সাথে আপনার আবার কিসের কথা থাকতে পারে.?

তারপর তুবার দিকে তাকিয়ে বলল,

_চল, উঠি।

 

তুবাও উঠে দাঁড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে তালহা এসে হাজির। ক্যান্টিনে তখন তারা ছাড়া আর কেউ নেই। তিনটার কাছাকাছি সময়, সবাই অনেক আগেই লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে গেছে। তালহাকে দেখে এবং আরুকে চলে যেতে দেখে আদ্রিশ আর নিজেকে সামলাতে পারল না,

আরু জান, শোন না। আমার কথাটা শোন। রাগ, অভিমান, অভিযোগ, সব তো আমরা একসাথে বসেই মিটিয়ে নিতে পারি। এভাবে দুরে দুরে থাকলে কি কোনো কিছু সমাধান হবে বল.?

 

আরু জানশুনে আরুর পা থমকে গেল। কী অদ্ভুত এক আদুরে ডাক। বুকের ভেতরটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে উঠল। ঠিক তখনই সামনে থেকে ভেসে এলো,

_আরু বেইবি,

 

আরু চমকে সামনে তাকাল। তালহা দাঁড়িয়ে আছে। পেছন থেকে তালহার মুখে আরু বেইবিডাকটা শুনে আদ্রিশের ভেতরের রাগ যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। তুবা একবার আদ্রিশ, একবার তালহার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। এই দৃশ্যটা সে অদ্ভুতভাবে উপভোগ করছে। ইচ্ছা করেই তো সে তালহাকে মেসেজ দিয়ে ডেকেছে।

আর এক মুহূর্তও দেরি করল না আদ্রিশ। আচমকা আরুর হাত ধরে টানতে টানতে এগিয়ে গেল। যাওয়ার আগে তালহার মুখোমুখি

Share :

Recent Post