blog
Super Admin Views :94

ছোটদের কবি রবীন্দ্রনাথ

 

মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে

মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।

তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে

দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,

আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে

টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।

রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে

রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।

 

 

মায়ের কাছে কল্পিত অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি শুনতে গিয়ে মাকে একদল ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করে ছোট্ট খোকা। ভয়ংকর ডাকাত দলকে কুপোকাত করে নিজের মাকে নিয়ে বীরের বেশে অজানার দেশে পাড়ি জমায় সেই বালক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বীরপুরুষকবিতায় শিশুদের কল্পনা রঙিন ভুবনের সন্ধান দেয়ার পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে গিয়ে এভাবেই কবিতা রচনা করেছেন।

 

বাঙালির ভালোবাসার কবি রবীন্দ্রনাথ তার বিভিন্ন লেখায় শিশুদের কল্প-জগতের বর্ণিল ছবি আঁকতে গিয়ে একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে চেয়েছেন তাদের। বড়দের জন্য যেমন তিনি কবিতা, গল্প, গান, নাটক, উপন্যাস লিখে গেছেন তেমনি শিশুদের স্বপ্ন, চিন্তা, দুষ্টুমি কিংবা আনন্দ-উল্লাস নিয়েও রয়েছে তার অসংখ্য ছড়া, কবিতা, গান, গল্প, নাটকসহ নানারকম শিশুতোষ রচনা। মায়ের সাথে শিশুর যে মধুময়  নিবিড় সম্পর্ক, তা পৃথিবীতে আর কারো সাথেই তুলনা করা যায় না। 

 

শৈশবে মাকে হারানোর পর কবির সমস্ত হৃদয়জুড়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন মা। তার অন্তরের এ হাহাকার আবার নতুন করে অনুভব করলেন নিজের মাতৃহারা সন্তানদের দেখে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মারা যাওয়ার সময় ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথের বয়স ছিল আট বছর। মেয়ে রেনুকার বারো আর মীরার ছিল দশ বছর।

 

মা-হারা সন্তানদের দেখাশোনা করতে গিয়ে তাদের অতি আপনজন হয়ে উঠলেন তিনি। মেয়ে রেনুকা কঠিন যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হলে হাওয়া বদল করতে তাকে নিয়ে আলমোড়ায় গিয়েছিলেন। সেই পাহাড়ি পরিবেশে কবি সন্তানদের নিবিড়ভাবে পেয়েছিলেন। সেখানেই রচনা করেছেন কবির শিশুকাব্যের অধিকাংশ কবিতা। তিনি লিখেছেন

 

খোকা মাকে শুধায় ডেকে,

এলেম আমি কোথা থেকে

কোনখানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে।

 

শিশু দেবলোক থেকে আসে ধুলোমলিন পৃথিবীতে। এখানে এসে সে মাকে যেমন পূর্ণ করে দেয় তেমনি শিশুও মাতৃস্নেহে আপ্লুত হয়ে স্নেহ-আদরে পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। শিশুর সাথে মায়ের এ সর্ম্পকে কবি তুই সম্বোধনে তুলে ধরেছেন তার কবিতায়

 

মা গো, আমায় ছুটি দিতে বল

সকাল থেকে পড়েছি মেলা।

 

প্রাণের আবেগ, উচ্ছ্বাসের শুধু কাব্যিক রূপায়ণই শুধু নয়। আনন্দ, আবেগ এবং কল্পশক্তির বিরল প্রকাশ ঘটেছে কবির কবিতায়। তাই ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ি কবিতায় তিনি লিখেছেন

 

ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির

পাচ বোন থাকে কালনায়

শাড়িগুলো তার উনুনে বিছায়

হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়।

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে দিয়ে শিশুর গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে পাখির মতো স্বাধীনভাবে ডানা মেলে দেয়ার ইচ্ছে যেমন ব্যক্ত হয়েছে তেমিন সাধারণ মানুষের মুক্ত জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে সাধকবিতায়।

 

শিশুর মনের ভিতর থাকে এক কল্প-জগত। শিশুদের নিয়ে লিখতে গিয়ে কবি নিজেও যেন শিশু বনে গেছেন। শিশুদের চাওয়া-পাওয়া, আধো-আধো কথা বলা তাঁর শিশুকাব্যে হয়েছে জীবন্ত-প্রাণবন্ত। কবির শিশুমন গলির পাশের ফেরিওয়ালাকে দেখে ফেরিওয়ালা, মালিকে দেখে মালি, পাহারাদারকে দেখে পাহারাদার আর ঘাটের মাঝি হতে চায়। এভাবেই শিশুর চাওয়া-পাওয়া, আধো আধো কথা তার কাব্যে আরো প্রাণবন্ত ও জীবন্ত হয়ে ওঠে। বৃষ্টিস্নাত মৌসুমে ছুটির ঘণ্টা বাজানোর ঢংয়ে তিনি লিখেছেন

 

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে

বাদল গেছে টুটি,

আজ আমাদের ছুটি ও ভাই,

আজ আমাদের ছুটি।

 

শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি লিখেছেন ছন্দের ঢেউ তোলা মিষ্টি মিষ্টি ছড়া-কবিতা। লিখেছেন মজার মজার গল্প ও নাটিকা। তাঁর লেখা শিশুতোষ গানের সংখ্যাও অনেক। যা ছোটো-বড়ো সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। শিশুদেরকে রবীন্দ্রনাথ ভীষণ ভালোবাসতেন। ওদের জন্য কখনো তিনি সৃষ্টি করেছেন কল্পনার জগত্। কখনো সাজিয়েছেন বাস্তবতার চিত্র। তাঁর লেখা শিশু ভোলানাথ’, ‘খাপছাড়া’, ‘শিশু’, ‘ছড়ার ছবিইত্যাদি আমাদের শিশুসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর লেখা ছোটগল্পে ফুটে উঠেছে এ দেশের অজপাড়া গাঁয়ের কিশোর-কিশোরীদের কথা।

 

ছুটিগল্পে ফটিকের মতো চির চঞ্চল চরিত্রকে তিনি চিত্রিত করেছেন। শিশুতোষ নাটক ডাকঘর’-এ তিনি এঁকেছেন অসুস্থ বালক অমলের আকুতিকে। অমল চায় বাইরের পৃথিবীটাকে দুচোখ ভরে দেখতে। কিন্তু কবিরাজের বারণ। তাকে সেড়ে তোলার জন্য সারাক্ষণ একটি ঘরে বন্দি রাখা হয়। সে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। সবাইকে অনুনয় করে বলে তাকে মুক্ত করে দিতে। রাজ বাড়ির ঘণ্টা, দূরের আকাশ, গাঁয়ের পথ ওকে হাত বাড়িয়ে ডাকে।

 

প্রকৃতিদরদী এই কবি প্রকৃতির নানান বিষয়কে তুলে এনেছেন শিশুতোষ ছড়া-কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ যখন ছোটদের জন্যে লিখেছেন তখন তিনি নিজেকে ছোট্ট শিশু ভেবেছেন। শিশুর কচি চোখের দৃষ্টিতে দেখেছেন আর লিখেছেন শিশুপাঠ্য ভাষাতেই। তাই কবি যখন ছোট নদীর কথা লিখলেন

 

আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে

 

কবিতাটি পড়তে পড়তে শিশুরা নিজের চোখে দেখা নদীটির মিল খুঁজে পায়। কেউ কেউ ধরেই নেয় তাদের গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির কথাই লেখা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন সচেতন খেয়ালি মনের মানুষ। বিচিত্র রকম সাধ বা ইচ্ছে ছিল তাঁর মনের মধ্যে। ছোটদের মতো তার মনটাও যখন যা দেখেছেন তাই করতে চেয়েছেন, তাই হতে চেয়েছেন।

 

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সব্যসাচী লেখক কবিগুরু সাহিত্যের সকল শাখায় পদচারণা করেছেন সগৌরবে। শুধু বড়দের নয় ছোটদের নিয়েও তিনি অনেক লেখা লিখে গেছেন। ছোটদের নিয়ে যে কবিতা, গল্প, নাটক লিখেছেন তার ভেতর আছে গভীর কোনো তত্ত্ব। বিশেষ করে শিশুশিশু ভোলানাথকাব্যে কবি শিশু মনের নানান রহস্য উন্মোচনে উদ্যোগী হয়েছেন। শিশুদের নিয়ে লেখা তার অন্যান্য বইয়ের মধ্যে আছে সহজপাঠ-১, সহজপাঠ-২, খাপছাড়া, ছড়া ও ছবি, গল্পস্বল্প, ছড়া, ছেলেবেলা, বিশ্বপরিচয়, লিপিকা, মুকুট প্রভৃতি। এ ছাড়াও সোনারতরী, কাহিনি, কড়ি ও কোমল, চিত্রা, ক্ষণিকা, কল্পনা, লেখন প্রভৃতি বড়দের বইয়েও শিশু-কিশোর উপযোগী অনেক কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

 

আধুনিক যুগে উন্নত চিন্তা এবং সাহিত্য প্রকাশের নতুন নতুন যেসব ধারা দেখা যায় তার মধ্যে ছোটগল্প একটি। উনিশ শতকে এসে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা এই তিন মহাদেশে কয়েকজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক একযোগে ছোটগল্প লেখা শুরু করেন। এরা হলেনফ্রান্সের গী দ্যা মপাসা’, রাশিয়ার আন্তন চেখভ’, ইংল্যান্ডের সমারসেট মম’, ভারতবর্ষের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এরা প্রত্যেকেই ছোটগল্প শুরু করেন নিজ নিজ দেশে নিজেদের মাতৃভাষায়।

 

বাংলা ছোটগল্প রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে হাঁটি হাঁটি পা করে এগোতে থাকে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নিরন্তর গতিতে এগিয়ে চলা তার ছোটগল্প ক্রমে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদরূপে বিবেচিত হয়। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে পদ্মার বাঁধভাঙা ঢেউ, ষড়ঋতুর লীলা-বৈচিত্র্য এবং

 

ভাগ্যহত মানুষের গভীর জীবনবোধ স্পষ্টভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে। তার ছোটগল্পে উঠে এসেছে গ্রাম-বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য, নদীর কুল কুল বয়ে চলা, পালতোলা নৌকার সারি।

 

মূলত, জমিদারী-সূত্রে বাংলাদেশে অবস্থানকালে গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি এবং প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা মানুষের কাছাকাছি এসে নতুন করে গল্প লেখায় অনুপ্রেরণা পান রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের প্রথম ছোটগল্প প্রকাশিত হয় ১২৮৪ সালের শ্রাবণ মাসে ভারতী পত্রিকার ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যায়। গল্পটির নাম ভিখারিনী। ১৮৯১ সালে সাপ্তাহিক হিতবাদীপত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পেয়ে রবীন্দ্রনাথ ছয় সপ্তাহে ছয়টি গল্প রচনা ও প্রকাশ করেন। গল্পগুলো হলোদেনা-পাওনা, গিন্নি, পোস্টমাস্টার, তারাপ্রসন্নের কীর্তি, ব্যবধান 

 

Recent Post